মতামত

ভাইভায় নম্বর  বাড়িয়ে কি মেধা কমানো হচ্ছে?

বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীদের কাছে পরীক্ষা শুধু পরীক্ষা নয়; এটি অনেকের জীবনের শেষ আশ্রয়। বছরের পর বছর পড়াশোনা, কোচিং, বই, নোট, রাত জাগা—সবকিছুর শেষে একজন তরুণ অন্তত এটুকু বিশ্বাস করতে চান যে পরীক্ষার খাতায় তিনি যতটা মেধা দেখাবেন, রাষ্ট্র তাঁর মূল্যায়নও ততটাই করবে। সেই জায়গাতেই ১১ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাবটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় ১১–১২ গ্রেডে লিখিত ১০০ ও মৌখিক ৫০, ১৩–১৬ গ্রেডে লিখিত ৬০ ও মৌখিক ৪০ এবং ১৭–২০ গ্রেডে লিখিত ২৫ ও মৌখিক ২৫ নম্বর রাখা হচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থায় যেখানে ভাইভায় ১০ নম্বর ছিল, সেখানে সর্বোচ্চ ৫০ করা মানে ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি। একই সঙ্গে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর প্রস্তাবও এসেছে।

এখানে প্রথম প্রশ্নটি খুব সোজা: ভাইভা কি পরীক্ষা নয়? অবশ্যই পরীক্ষা। কিন্তু সব পরীক্ষা একই ধরনের নয়। লিখিত পরীক্ষা একজন প্রার্থীর জ্ঞান, বিশ্লেষণক্ষমতা, ভাষা, যুক্তি ও প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে একই প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে যাচাই করে। ভাইভা আবার ব্যক্তিত্ব, যোগাযোগক্ষমতা, উপস্থিত বুদ্ধি, পরিস্থিতি সামলানোর দক্ষতা এবং কখনো কখনো বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যাচাই করতে পারে।

বিপদটা অন্য জায়গায়। লিখিত পরীক্ষার উত্তর খাতার সঙ্গে পরীক্ষকের ব্যক্তিগত পরিচয় থাকে না; ভাইভা বোর্ডের সামনে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকেন। সেখানে মূল্যায়নের মানবিক উপাদান ঢোকে, আর মানবিক উপাদানের সঙ্গে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, পক্ষপাত কিংবা প্রভাবের ঝুঁকিও ঢোকে। এ কারণেই ভাইভা থাকা নিয়ে আপত্তি নয়; আপত্তি হলো ভাইভাকে এমন ওজন দেওয়া, যাতে সেটি লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধাকে উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা পেয়ে যায়।

আমাদের রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত পরীক্ষার পদ্ধতি নয়, পরীক্ষার ওপর মানুষের আস্থা। একজন তরুণ যদি মনে করেন, লিখিত পরীক্ষায় ভালো করেও শেষ মুহূর্তে অদৃশ্য কোনো সম্পর্ক, সুপারিশ, লেনদেন বা বোর্ডের ব্যক্তিগত মূল্যায়ন তাঁর ভাগ্য বদলে দিতে পারে, তাহলে রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—যোগ্যতার ওপর বিশ্বাস—ক্ষয়ে যায়। অভিযোগ সত্য কি না, প্রতিটি ক্ষেত্রে তার প্রমাণ থাকা জরুরি; কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় শুধু দুর্নীতি ঠেকানো যথেষ্ট নয়, দুর্নীতির সুযোগ এবং দুর্নীতির সন্দেহ—দুটিই কমাতে হয়।

এ কারণেই এনটিআরসিএ নিয়ে আগস্টের বিতর্কটি এত তাৎপর্যপূর্ণ। ৩ আগস্টের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সভার কার্যবিবরণী নিয়ে এমন আলোচনা তৈরি হয় যে এনটিআরসিএর বদলে স্থানীয় ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা যেতে পারে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। পরে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্পষ্ট করে জানান, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি এবং ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

ঘটনাটি আসলে একটি বড় শিক্ষা দেয়। সরকার যখন এমন কোনো ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করে, যা মানুষের দীর্ঘদিনের অর্জিত প্রত্যাশার বিপরীত মনে হয়, তখন একটি প্রশাসনিক ব্যাখ্যাই যথেষ্ট হয় না; দরকার নীতির যুক্তি এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা। এনটিআরসিএ নিয়ে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল একই ভয়—মেধাভিত্তিক কেন্দ্রীয় বাছাই দুর্বল হলে স্থানীয় প্রভাব কি আবার নিয়োগের দরজায় ঢুকবে? এখন সরকারি চাকরির ভাইভা নম্বর বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে আসায় একই প্রশ্ন নতুন পোশাকে ফিরে এসেছে।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘ভাইবাও একটি পরীক্ষা।’ কথাটি তথ্যগতভাবে ঠিক। কিন্তু নীতিগত প্রশ্নটির উত্তর এতে শেষ হয় না। আসল প্রশ্ন হলো—একটি পরীক্ষা হিসেবে ভাইভার কত ওজন থাকা উচিত?

ভারতের উদাহরণ এখানে বেশ শিক্ষণীয়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি নিয়োগে সব পদের জন্য একই ধরনের ভাইভা নেই; অনেক নিয়োগেই লিখিত বা কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষার পর সরাসরি মেধাক্রমে বাছাই হয়। আবার উচ্চস্তরের সিভিল সার্ভিসে সাক্ষাৎকারের আলাদা ওজন আছে। অর্থাৎ ভারতীয় মডেলও একরৈখিক নয়। চীনের ক্ষেত্রেও লিখিত পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকার—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ; ২০২৬ সালের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নিয়োগে লিখিত ও সাক্ষাৎকারের ফল মিলিয়ে চূড়ান্ত মেধা নির্ধারণের ব্যবস্থা দেখা যায়। ফলে ভারত-চীন কেউই এমন সরল সূত্র দেয় না যে ‘ভাইভা বাদ দাও’; বরং আন্তর্জাতিক শিক্ষা হলো—পদের প্রকৃতি অনুযায়ী ভাইভার ওজন নির্ধারণ করতে হবে এবং মূল্যায়নকে যতটা সম্ভব কাঠামোবদ্ধ করতে হবে।

তরুন সমাজের আপত্তি আরও মৌলিক। ১৭–২০ গ্রেডে লিখিত ও মৌখিক—দুটিতেই ২৫ নম্বর রাখা হলে একজন প্রার্থীর লিখিত মেধা ও বোর্ডের মূল্যায়ন কার্যত সমান শক্তি পেয়ে যায়। একজন প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থেকেও ভাইভায় পিছিয়ে পড়লে চূড়ান্ত ফল পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। ১৩–১৬ গ্রেডেও ভাইভার ৪০ নম্বর মোট নম্বরের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি। নিম্ন গ্রেডের চাকরিতে যেখানে বিপুলসংখ্যক তরুণ আবেদন করেন, সেখানে এই ওজন আরও সংবেদনশীল।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই মেধাভিত্তিক নিয়োগ চায়, অভিজ্ঞ মহলের বিবেচনায় সাধারণ নিয়োগে ভাইভার অংশ ৫ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। তবে শুধু নম্বর কমালেই হবে না। ভাইভা বোর্ডের সদস্যদের প্রশিক্ষণ, একই প্রশ্নের কাঠামো, নম্বর দেওয়ার নির্দিষ্ট মানদণ্ড, বোর্ডভিত্তিক নম্বরের অস্বাভাবিক তারতম্য পর্যালোচনা, পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ—সবই দরকার। আধুনিক রাষ্ট্রে নিয়োগের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো প্রার্থী যেন মনে করেন, তাঁকে হারিয়েছে অন্য একজনের মেধা; কোনো অদৃশ্য হাত নয়।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন লাখ লাখ তরুণ রাষ্ট্রীয় চাকরির পরীক্ষায় শুধু চাকরি খুঁজছেন না; তাঁরা রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ন্যায্য চুক্তি খুঁজছেন। তাঁদের বলা হচ্ছে—পড়ো, প্রস্তুতি নাও, প্রতিযোগিতা করো। রাষ্ট্রের পাল্টা কথাটিও তাই পরিষ্কার হওয়া দরকার—‘তুমি লিখিত পরীক্ষায় তোমার মেধা প্রমাণ করো, আমরা তোমার মূল্যায়নের দরজা যতটা সম্ভব স্বচ্ছ রাখব।’

ভাইভা থাকুক। ব্যক্তিত্ব যাচাই হোক। কিন্তু ভাইভা যেন লিখিত মেধার কবরখানা না হয়। রাষ্ট্রের চাকরি রাষ্ট্রের সম্পদ; সেটি কারও মামা-খালুর উত্তরাধিকার নয়, কোনো বোর্ডের ব্যক্তিগত রুচির পুরস্কারও নয়। বাংলাদেশের তরুণেরা আসলে খুব বেশি কিছু চাইছেন না—তাঁরা শুধু চান, তাঁদের ভাগ্যটা যেন পরীক্ষার খাতায় লেখা থাকে।

মো. মাহমুদুল হাসান

ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

নেপাল ও চীনে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১৪১০, নিখোঁজ ৫৬৫০

নেপাল ও চীন সীমান্তে গত মাসের শেষের দিকে আঘাত হানা প্রলয়ঙ্কারী বন্যা...

মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি পেলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস

চট্টগ্রামে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মা সন্ধ্যা রাণী ধরের শেষকৃত্যানু...

ইসরাইলের ঘনিষ্ট মিত্র স্লোভেনিয়া

স্লোভেনিয়ার জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী ইয়ানেজ ইয়ানশার নেতৃত্বে দেশটির পররা...

আলকারাজকে হারিয়ে সেমিফাইনালে শেলটন

নিউইয়র্কের রাত কখন ভোরে গড়ায়, বোঝা কঠিন। তবে আর্থার অ্যাশ স্টেড...

প্রকল্পে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকা...

গুরুত্বপূর্ণ আল-মাখা শহর হুতিদের দখলে

ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে বড় ধরনে...

দেশের স্বার্থে র‍্যাবের মতো সংগঠনের প্রয়োজন রয়েছে: লুৎফুজ্জামান বাবর

দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও জনগণের সামগ্রিক নিরাপত্তার স্বার্থে র‍্যাবে...

খালেদা জিয়া ছিলেন গণতান্ত্রিক রাজনীতির ঐক্যের প্রতিক : গোলাম মোস্তফা 

রাজনৈতিক অঙ্গনে মত ফারাক থাকলেও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন গণতান...

ভাইভায় নম্বর  বাড়িয়ে কি মেধা কমানো হচ্ছে?

বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীদের কাছে পরীক্ষা শুধু পরীক্ষা নয়; এটি অনেকের জীবনের শ...

জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে জাতীয় ক্রাইসিস রেসপন্স সিস্টেম গঠনের দাবি

মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় জরুরি সেবা নিশ্চিত এবং একটি কার্যকর জাতীয় মান...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা