রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। শুরুতে মাদকের বিষয়টি সামনে এলেও এখন পুলিশের ধারণা, হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু ইয়াবা সেবন কিংবা তা দেখে ফেলার ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, জমি-সংক্রান্ত বঞ্চনা ও পারিবারিক-সামাজিক দূরত্বও ভূমিকা রাখতে পারে।
রংপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, আদালতে গ্রেপ্তার দুইজন—মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস—যে জবানবন্দি দিয়েছে এবং সাক্ষী সিদ্ধার্থের বন্ধু-প্রতিবেশী সীমান্ত দাস ও দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ মোহন্ত যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেগুলোর মধ্যে মিল পাওয়া গেছে। সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ জানিয়েছে, রাত ২টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত সীমান্তের বাসায় বসে তারা ইয়াবা সেবন করে। পরে সেখান থেকে তারা ঘটনাস্থলের দিকে যায়। সাক্ষী সীমান্তও একই তথ্য দিয়েছেন।
তবে পুলিশের এই কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু মাদকের কারণে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটেছে—এমনটা মনে করার সুযোগ নেই। তার ভাষায়, হত্যার ধরন ও নৃশংসতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এর পেছনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ বা ক্রোধ কাজ করে থাকতে পারে।
সনাতন চক্রবর্তী বলেন, দুই পরিবার পাশাপাশি বসবাস করলেও তাদের আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের পার্থক্য ছিল। একদিকে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল পরিবার, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবার। আদালতে দেওয়া জবানবন্দি ও অন্যান্য তথ্য থেকে জানা গেছে, যে জমির ওপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি নির্মিত হয়েছে, সেটি একসময় সিদ্ধার্থদের পরিবারের মালিকানাধীন ছিল। জমি-সংক্রান্ত বঞ্চনা থেকে ক্ষোভ, হতাশা বা আক্রোশ তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তাই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও গভীর কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তীর ছয় শতক জমির ওপর নির্মিত বাড়িটির পাশেই সিদ্ধার্থ দাসদের বাড়ি। দুই বাড়ির মাঝখানে রয়েছে একটি প্রাচীর। সিদ্ধার্থদের অংশে টিনের দুটি ঘর ও একটি ছোট দোকান রয়েছে।
সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় চন্দ্র দাস জানান, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি যে জমির ওপর নির্মিত, সেটি তাদের দাদা চন্দ্র মোহন দাসের সম্পত্তি ছিল। মোট আট শতক জমির মধ্যে দুই শতকে তাদের বাড়ি এবং বাকি ছয় শতক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির অংশ।
বিনয় চন্দ্রের ভাষ্য, তার বাবা দীনেশ চন্দ্র দাস চার ভাই ছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রত্যেকে দুই শতক করে জমি পান। তার তিন কাকা প্রায় ১৫ বছর আগে নিজেদের ছয় শতক জমি রবি ঠাকুরের কাছে বিক্রি করেন। তবে জমির দলিল গণপতি চক্রবর্তীর নামে করা হয়। রবি ঠাকুরের সঙ্গে গণপতি চক্রবর্তীর আর্থিক লেনদেন কীভাবে হয়েছে, তা তিনি জানেন না।
নিজের দুই শতক জমিতে স্ত্রী, দুই ছেলে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে বসবাস করতেন বিনয় দাস। তার ছোট ভাই বিজয় দাসের নিজস্ব বাড়ি না থাকায় তিনি পাশের একটি ভাড়া বাড়িতে থাকেন। ছয় মাস আগে সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ বিয়ে করলে বাড়িতে থাকার জায়গার সংকট তৈরি হয়। এরপর সিদ্ধার্থ তার কাকা বিজয় দাসের বাড়িতে থাকা শুরু করেন। সেখান থেকেই শনিবার (২২ আগস্ট) রাত সাড়ে ৩টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিদ্ধার্থ ও তার বড় ভাই পার্থ দুজনই স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। বাবা বিনয় দাস মাছের ব্যবসার পাশাপাশি কীর্তন করেন। আর মা বাড়িতে মুদিখানার দোকান চালান।
বিনয় চন্দ্র দাস বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করে আসছেন। অর্থের অভাবে তারা জমি কিনতে পারেননি। তার কাকারা জমি রবি ঠাকুরের কাছে বিক্রি করলেও শেষ পর্যন্ত সেটি গণপতি চক্রবর্তীর নামে দলিল করা হয়।
সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ দাস বলেন, জমিটি তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তি ছিল। গণপতি চক্রবর্তী বাড়ি নির্মাণের পর তিনি কখনো তাদের বাড়িতে যাননি এবং গণপতি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। শুধু রাস্তায় দেখা হলে সৌজন্য বিনিময় হতো।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তীর পরিবারের সঙ্গে আশপাশের প্রতিবেশীদের সামাজিক যোগাযোগও ছিল খুবই সীমিত। পাশাপাশি বাড়ি হলেও দুই পরিবারের মধ্যে মেলামেশা ছিল না বললেই চলে। পুরো এলাকায় দাস পরিবারের একাধিক বাড়ি থাকলেও চক্রবর্তী পরিবার ছিল ভিন্ন একটি পরিবার। আর্থিক বৈষম্যের পাশাপাশি এই সামাজিক দূরত্বও দুই পরিবারের মধ্যে দূরত্ব তৈরির অন্যতম কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
পাশের বাড়ির বাসিন্দা বৃদ্ধা সনেকা দাস বলেন, গণপতি চক্রবর্তীদের বাড়িতে সাধারণত কেউ যেতেন না। তারাও খুব একটা কারও সঙ্গে মিশতেন না। আর্থিক অবস্থার পার্থক্যের কারণে সামাজিক দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২২ আগস্ট গভীর রাতে মাছুয়াপাড়া এলাকার নিজ বাড়ির ছাদ, চিলেকোঠা ও ঘর থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে পার্থী চক্রবর্তী আগামী (২৫) এবং ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী আয়ুশের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
গণপতি চক্রবর্তী গত ডিসেম্বরে রংপুর জেলা স্কুল থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবা দিতেন।
আমার বাঙলা/ রাব্বি