বুধবার সকালে নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তবর্তী জেলা রাসুয়ায় ভোটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা বা হড়পা বানে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেয়। নেপাল সরকারের তথ্য অনুযায়ী, রাসুয়ায় ৩৯৩ জন বিদেশি পর্যটকসহ প্রায় ৬০০ জন নিখোঁজ হয়েছেন।
নিখোঁজ পর্যটকদের একটি অংশ ছিলেন তীর্থযাত্রী। তারা কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ওই পথে যাচ্ছিলেন।
আবহাওয়াবিদ ও ভূতত্ত্ববিদদের প্রাথমিক ধারণা, তুষারধসের কারণেই ভোটেকোশি নদীতে এই ভয়াবহ হড়পা বান নেমে থাকতে পারে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ভূবিজ্ঞানীদের একাংশ জানিয়েছেন, তুষারধসের ফলে পাথর ও বরফের স্তূপে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে যায়। এতে পানি জমতে থাকে এবং একপর্যায়ে পানির প্রবল চাপে সেই প্রাকৃতিক ‘অবরোধ’ ভেঙে গিয়ে সৃষ্টি হয় বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি নদী লেহন্দে। হিমালয় অঞ্চলের ভোটেকোশি নদীর প্রধান শাখানদীগুলোর একটি এটি।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ইঙ্গিত মিলেছে, তুষারধসের কারণে লেহন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি, হিমবাহের বরফগলা পানিতে পূর্ণ কোনো হ্রদ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
বুধবার নেপালের পার্লামেন্টে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানান, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের দিকে একটি ভূমিকম্প হয়। এর পরপরই একটি তুষারধসের ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, সরকারের হাতে থাকা প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে ভোটেকোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের কাজ এখনও চলছে।
বন্যায় রাসুয়ার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নুয়াকোট ও ধাদিং জেলাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থের মতে, লেহন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ পানি জমে যায়। পরে পানির চাপে পাথরের স্তর ভেঙে সেই পানি প্রবল স্রোতে ভোটেকোশি নদীতে নেমে আসে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের দাবি, হড়পা বানটি চীন-অধিকৃত তিব্বতের দিক থেকে নেমে এসেছে। অধ্যাপক রিজন কায়স্থ বলেন, নেপালের দিক থেকে তুষারধস নেমে সীমান্তবর্তী এলাকায় লেহন্দে নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রায় একই সময়ে তিব্বতীয় এলাকাতেও একটি ভূমিকম্প হয়েছিল বলে জানান তিনি।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বতীয় ভূখণ্ডে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর উপকেন্দ্র ছিল রাসুয়া জেলার গোঁসাইকুণ্ডের প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়েও ভোটেকোশি নদীতে একই ধরনের হড়পা বান আঘাত হেনেছিল। সে সময় অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাসুয়ায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি হিমবাহের হ্রদ ভেঙে যাওয়ার কারণে লেহন্দে নদীতে আকস্মিক জলস্রোত নেমেছিল।
তবে এই ধরনের দুর্যোগের পেছনে শুধু তাৎক্ষণিক প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় হিমালয়ের হিমবাহ গলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল।
ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান ও চীন-অধিকৃত তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৪০ বছর ধরে উপগ্রহের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ওই গবেষণাটি করা হয় এবং তা ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। গবেষকেরা জানান, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত যে হারে হিমালয়ের হিমবাহের বরফ গলছিল, ২০০০ সালের পর সেই হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
গবেষণাটির প্রধান গবেষক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জোশুয়া মরার জানান, গত চার দশকে হিমালয়ের হিমবাহগুলোর প্রায় এক-চতুর্থাংশ বরফ হারিয়েছে। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি হিমালয়জুড়ে উন্নয়নের নামে বনভূমি ধ্বংস, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও সুড়ঙ্গ খননের মতো কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও ভূমিধস মোকাবিলা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি