১৯৯৫ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পিক পাহাড় থেকে ২০ থেকে ২৫টি দলছুট বন্য হাতি শেরপুরের গারো পাহাড় এলাকায় চলে আসে। পরে ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাধার কারণে হাতিগুলো আর ফিরে যেতে পারেনি। এরপর থেকেই এ অঞ্চলে মানুষ ও হাতির সংঘাত বাড়তে থাকে।
নালিতাবাড়ীর কালাপানি এলাকার কৃষক বিজয় কুবি বলেন, প্রায় দুই দশক ধরে হাতির সঙ্গে লড়াই করেই জীবন কাটছে তার। প্রতি বছর কষ্ট করে ফলানো ফসল হাতির পাল নষ্ট করে দেয়। অনেক সময় বসতবাড়িতেও হামলা চালায় হাতি।
নানা উদ্যোগেও মেলেনি স্থায়ী সমাধান
মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। ২০১৪ সালে সীমান্ত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সৌরবিদ্যুৎচালিত প্রায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বৈদ্যুতিক বেড়া নির্মাণ করা হয়।
পরে ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচি ও কর্নঝুড়া এলাকায় হাতির খাবারের জোগান নিশ্চিত করতে ১০০ হেক্টর বনভূমিতে বিশেষ বাগান গড়ে তোলা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় লেবু ও বেতকাঁটার বাগানও করা হয়েছে।
হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণে সীমান্ত এলাকায় ১৬টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ি গ্রামগুলোতে হাতি তাড়াতে আলো, টর্চ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রও বিতরণ করা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব উদ্যোগে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। পাহাড়ি এলাকায় খাবারের সংকট থাকায় হাতির পাল বারবার লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
হাতির গতিবিধি শনাক্ত করবে এআই
মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত কমাতে এবার প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। হাতির চলাচল শনাক্ত করে স্থানীয়দের আগাম সতর্ক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে নালিতাবাড়ীর হাতি উপদ্রুত এলাকায় ১৫টি এআইনির্ভর আগাম সতর্কীকরণ যন্ত্র বসানো হবে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে হাতির গতিবিধি শনাক্ত করে দ্রুত স্থানীয়দের সতর্ক করা সম্ভব হবে। এতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হাতিকে লোকালয় থেকে দূরে রাখতে বনের ভেতরে খাবার ও পানির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। হাতির বিচরণক্ষেত্রে জলাধার তৈরি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলায় গভীর পাম্প বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, গারো পাহাড়ের প্রায় ৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় শতাধিক হাতির বিচরণ রয়েছে। হাতির পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, হাতিকে কোনোভাবেই বিরক্ত করা যাবে না। এ বিষয়ে বন বিভাগ ও হাতি মোকাবিলা দলের মাধ্যমে স্থানীয়দের সচেতন করা হচ্ছে।
আবাসস্থল সংকটে বাড়ছে সংঘাত
পরিবেশবাদীদের মতে, গারো পাহাড়ে বন উজাড় ও মানুষের অবাধ চলাচলের কারণে হাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কমে যাচ্ছে খাবারের উৎস। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে হাতিগুলো লোকালয়ে প্রবেশ করছে।
গারো পাহাড়, বন্য প্রাণী ও নদী রক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা বিপ্লব দে কেটু বলেন, হাতি প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ ও হাতির মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খানের মতে, মানুষ ও হাতির সংঘাত নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। গারো পাহাড়ের হাতির আবাসস্থলের ধারণক্ষমতা এবং সেখানে বর্তমানে কত হাতি রয়েছে, তা নির্ধারণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা উচিত।
বিশ্বজুড়েই হুমকির মুখে হাতি
এশীয় ও আফ্রিকান হাতি বিশ্বজুড়েই নানা হুমকির মুখে রয়েছে। দাঁতের জন্য চোরাশিকার, বন ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং পর্যটন ও বিনোদনের নামে নির্যাতন—সবকিছুই হাতির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশাল আকৃতির এই প্রাণীর সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে মানুষের কর্মকাণ্ড। তাই বিশ্ব হাতি দিবসে হাতি সংরক্ষণ এবং মানুষ ও হাতির মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি