ছবি: সংগৃহীত
সারাদেশ

পাটের সোনালি স্বপ্নে কালো মেঘ, লোকসানের শঙ্কায় কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক

একসময় পাটকে বলা হতো ‘সোনালি আঁশ’। পাট ঘিরে কৃষকের স্বপ্ন ছিল—ফসল ঘরে তুলবেন, বাজারে ভালো দাম পাবেন, আর সেই অর্থে মিটবে সংসারের প্রয়োজন। তবে সেই স্বপ্ন এবার অনেকটাই ম্লান রাজবাড়ীর কৃষকদের কাছে। ফলন কম, উৎপাদন খরচ বেশি, এর সঙ্গে বাজারে পাটের দরপতন—সব মিলিয়ে লাভ তো দূরের কথা, মূলধন ফেরত পাওয়া নিয়েই শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।

রাজবাড়ীর বিভিন্ন এলাকার পাটচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অনেক জমিতেই পাটের ফলন আশানুরূপ হয়নি। কোথাও বিঘাপ্রতি ৬ মণ, আবার কোথাও ৩ থেকে ৪ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। অন্যদিকে পাট কাটা, পরিবহন, জাগ দেওয়া, ধোয়া এবং শ্রমিকের মজুরি—সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে খরচ।

বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাট বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে। কৃষকদের দাবি, এই দামে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন। অন্তত ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করতে পারলে কিছুটা লাভের মুখ দেখা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।

বিঘায় ৬ মণ পাটে খরচ ১২ হাজার টাকা

বালিয়াকান্দি উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের মাশালিয়া বিল গ্রামের কৃষক জামাল শেখ এবার এক বিঘা জমিতে মাত্র ৬ মণ পাট পেয়েছেন। কিন্তু সেই পাট ঘরে তুলতেই তাকে গুনতে হচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা।

জামাল শেখ বলেন, এবার মাঠে পাটের ফলন ভালো হয়নি। বাজারদরও কম। এক বিঘা পাট কাটতে প্রায় ৬ হাজার টাকা এবং ধুতে আরও ৬ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সব মিলিয়ে শুধু কাটা ও ধোয়ার খরচই দাঁড়াচ্ছে ১২ হাজার টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়।

তিনি বলেন, পাট বোনা থেকে শুরু করে নিড়ানো, কাটা, জাগ দেওয়া ও ধোয়া পর্যন্ত সব খরচ হিসাব করলে বর্তমান বাজারদরে কৃষকের হাতে তেমন কিছুই থাকছে না।

জামাল শেখের ভাষায়, এক মণ পাটের দাম ৫ হাজার টাকা হলে কৃষক কিছুটা স্বস্তি পেতেন। কিন্তু বর্তমান দামে এক বিঘায় ৬ মণ পাট উৎপাদন হলেও সব খরচ বাদ দিয়ে লাভ করা কঠিন।

অন্যান্য ফসলেও লোকসানের অভিযোগ

শুধু পাট নয়, প্রায় সব ফসল নিয়েই একই ধরনের অভিযোগ কৃষকদের। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে তুলনায় কৃষিপণ্যের দাম বাড়ছে না।

সদর উপজেলার মূলঘর ইউনিয়নের বাঘিয়া গ্রামের কৃষক অমল কুমার দাস বলেন, এবার কৃষকের অবস্থা খুবই খারাপ। তেল, বিদ্যুৎ ও সার—সবকিছু নিয়েই সমস্যা রয়েছে। পয়সা দিয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ পাওয়া যায় না। এভাবে চললে কৃষক কীভাবে চাষাবাদ করবেন, সেটিই বড় প্রশ্ন।

তিনি জানান, ধানের দাম কম এবং পেঁয়াজ চাষ করেও কৃষকদের লোকসান গুনতে হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ও কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি ফসলের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

অমল কুমার দাস বলেন, একজন শ্রমিকের মজুরি ১ হাজার ২০০ টাকা হলেও এক মণ পেঁয়াজের দাম অনেক সময় তার চেয়েও কম। এ অবস্থায় কৃষকের ঘরে লাভের টাকা যাবে কীভাবে?

কৃষক মোসলেম মোল্লার হিসাবও প্রায় একই। তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে এবার ৬ থেকে সাড়ে ৬ মণ পাট হচ্ছে। শুধু পাট কাটতেই প্রায় ৮ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এরপর রয়েছে ধোয়ার খরচ।

মোসলেম মোল্লা বলেন, এক বিঘা পাট কাটতে প্রায় ৮ হাজার টাকা লাগে। ধোয়ার সময় প্রতি আঁটিতে ৬ টাকা করে দিতে হচ্ছে। সার, বীজসহ অন্যান্য উপকরণের দামও বেশি। আমরা যে ফসল বিক্রি করি, সেটির দামই কম। এভাবে চললে কৃষকের পোষাবে না।

দুই মাসে ৫ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা

পাটের বাজারদর নিয়ে কৃষকদের ক্ষোভ সবচেয়ে বেশি। তাদের দাবি, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে পাটের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

জামাল শেখ বলেন, দুই মাস আগেও পাটের দাম ছিল প্রায় ৫ হাজার টাকা মণ। এরপর তা সাড়ে ৪ হাজারে নেমে আসে। বর্তমানে সেই পাট বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে। দাম ৪ হাজার টাকার ওপরে থাকলেও কৃষক কিছুটা স্বস্তি পেতেন।

অর্ধেকে নেমেছে পাটের ফলন

বানিবহ ইউনিয়নের নিচপাড়া গ্রামের কৃষক ইউনূস আলী বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এবার পাটের ফলন কম হয়েছে। আগে এক পাখি জমিতে ৭ থেকে ৮ মণ পর্যন্ত পাট পাওয়া গেলেও এবার অনেক জমিতে ফলন নেমে এসেছে ৩ থেকে ৪ মণে।

তার মতে, পাটের দাম ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা মণ হলে কৃষক কিছুটা লাভবান হতে পারতেন। বর্তমান বাজারদরে পাট চাষ করে খরচ তোলা কঠিন।

পাট রপ্তানি বাড়ানোর দাবি

কৃষকদের মতে, দেশে উৎপাদিত পাটের বাজার সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি বাড়ানো গেলে বাজারে পাটের চাহিদা বাড়বে। এতে দামও কিছুটা বাড়তে পারে এবং কৃষক পাট চাষে উৎসাহিত হবেন।

ইউনূস আলী বলেন, সরকারের উচিত কৃষকদের দিকে আরও নজর দেওয়া। পাট রপ্তানি বাড়ানো গেলে কৃষক ভালো দাম পেতেন এবং পাট চাষেও আগ্রহ বাড়ত।

তিনি জানান, মৌসুমে পেঁয়াজের দামও কম থাকায় কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একইভাবে পাটের দাম আরও কমে গেলে আগামী মৌসুমে অনেক কৃষক পাট চাষ থেকে সরে যেতে পারেন।

‘সোনালি আঁশ’ কি কৃষকের বোঝা হয়ে যাচ্ছে?

একসময় পাট ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা। ভালো ফলন ও ন্যায্য দাম কৃষকের সংসারে স্বস্তি আনত। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে পাটের দরপতনে সেই চিত্র বদলে গেছে।

কৃষকদের কাছে পাট এখন শুধু একটি ফসল নয়, বরং খরচের টাকা উঠবে কি না—সেই অনিশ্চয়তারও নাম।

তাদের দাবি, পাটের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার, রপ্তানি বাড়ানো, উৎপাদন উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষকদের কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে একসময় যে ‘সোনালি আঁশ’ কৃষকের স্বপ্ন দেখাত, সেই পাটই ভবিষ্যতে তাদের কাছে লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কমেছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আবাদ

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটের ফলন কিছুটা কম হয়েছে। পাশাপাশি জেলায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম জমিতে পাট চাষ হয়েছে।

চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৯ হাজার ৬৬২ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে ৪৭ হাজার ৭৮০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৮৮২ হেক্টর কম জমিতে পাট চাষ হয়েছে।

এর মধ্যে পাংশায় ১২ হাজার ৩০০ হেক্টর, বালিয়াকান্দিতে ১২ হাজার ১৫০ হেক্টর, কালুখালীতে ৯ হাজার ৮৫০ হেক্টর, রাজবাড়ী সদরে ৯ হাজার ২৬০ হেক্টর এবং গোয়ালন্দে ৪ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ৪৭ হাজার ২৭৬ হেক্টর, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৬ হাজার ১৫৮ হেক্টর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪৯ হাজার ৫০ হেক্টর এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৯ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছিল।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম রসূল বলেন, গত বছর পাটের দাম ভালো থাকায় চলতি মৌসুমে কৃষকেরা বেশি জমিতে পাট চাষ করেছেন। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ও অনুকূল তাপমাত্রার কারণে এবারও উৎপাদন ভালো হওয়ার আশা রয়েছে। তবে পাটের বাজারদর এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। দেশে কাঁচা পাটের ব্যবহার সীমিত হওয়ায় রপ্তানি না বাড়লে বাজারে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না।

তিনি আরও বলেন, গত বছরের অনেক পাট এখনো কৃষকদের ঘরে মজুত রয়েছে। সাধারণত যে ফসলের দাম ভালো পাওয়া যায়, পরের বছর কৃষকেরা সেই ফসল বেশি আবাদ করেন। বিপরীতে দাম না পেলে ওই ফসলের আবাদে আগ্রহ কমে যায়। উৎপাদন খরচও যদি উঠে না আসে, তাহলে আগামী বছর পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমতে পারে। এতে পাটের উৎপাদনও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নাঈম আহমেদ বলেন, এখনো সরকারিভাবে পাটের মূল্য নির্ধারণের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত অধিদপ্তরে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হবে।

আমার বাঙলা/ রাব্বি

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

রুশ হামলায় নিহত ১২, জেলেনস্কির অভিযোগ

ইউক্রেনজুড়ে রাতভর ব্যাপক হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে অন্তত ১২ জন নিহত এবং কয়েক...

মনোহরদীতে নবাগত ইউএনওর সঙ্গে সাংবাদিকদের মতবিনিময়

নরসিংদীর মনোহরদীতে নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহামুদুল হাসানের...

যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে কিয়েভের প্রস্তাব

রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের অবসান চায় ইউক্রেন। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্...

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে লাফ

মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজে হামলার ঘটনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে চলমান আলোচন...

টাকার বিনিময়ে নিয়োগ বিএনপির ঐতিহ্য: মুজিবুর

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ম্যানেজিং কমিটির হাতে দেওয়...

নতুন আবহে ‘সোলস’-এর কালজয়ী গান

দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর অন্যতম ‘সোলস’। দীর্ঘ পাঁচ দশকের পথচলায়...

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি পদ ছাড়লেন লিভিট

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন ও দপ্তর হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রে...

যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত, নিহত ২

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে দুই সেন...

২৩ বছর পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা

আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে বলে...

ইয়েমেনে মার্কিন হামলায় ১৫৩ বেসামরিক নিহত

ইয়েমেনে ২০২৫ সালে দফায় দফায় সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব হামলায় দ...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা