রাজধানী ঢাকায় বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই নাগরিকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়ায় জলাবদ্ধতা। কয়েক ঘণ্টার মাঝারি বা ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় করার পরও কেন এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলছে না?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেনেজ উন্নয়নে ৮০০ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত এর মধ্যে প্রায় ১৭৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে নতুন ড্রেন নির্মাণ, পুরোনো ড্রেন সংস্কার, পুনর্বাসন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জলাবদ্ধতা কমাতে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি নর্দমা, খাল ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কারের জন্য বরাদ্দ ৪০ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে।
তবে এত অর্থ ব্যয়ের পরও বর্ষা এলেই রাজধানীর চিত্র বদলায় না। সামান্য সময়ের বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। এতে শুধু যানজটই নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার মূল কারণ শুধু অতিবৃষ্টি নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে খাল ভরাট, জলাধার দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নদীতে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং অল্প সময়েই পানি জমে যাচ্ছে।
সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ, বর্ষাকালেই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়। এতে নির্মাণসামগ্রী, মাটি এবং আবর্জনা ড্রেনে জমে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। খাল পুনরুদ্ধার, পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ সচল রাখা এবং পলিথিনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তিনি বলেন, বর্তমানে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে এবং এগুলোর পূর্ণ সুফল পেতে অন্তত এক বছর সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের মতে, রাজধানীর খাল পুনঃখনন ছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থার পূর্ণ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। খালগুলো পুনরুদ্ধার করা গেলে বিদ্যমান ড্রেনেজ অবকাঠামো আরও কার্যকর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষ্য, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ বা সংস্কার করলেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে না। রাজধানীর হারিয়ে যাওয়া খাল, জলাধার এবং প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে হাতিরঝিলের আদলে আরও কয়েকটি রিটেনশন এরিয়া গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে সংরক্ষণ করা যায় এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কার্যকর নগর পরিকল্পনা, নিয়মিত ড্রেন ও খাল রক্ষণাবেক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নাগরিক সচেতনতা—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত না হলে প্রতিবছর একই ধরনের জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
রাজধানীর মানুষ তাই এখন জানতে চান, কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব সুফল কবে মিলবে? উত্তর খুঁজতে হলে শুধু নতুন প্রকল্প নয়, বরং খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধারের দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
আমার বাঙলা/ জামান