সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে কওমি মাদরাসায় শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভিডিওতে একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে দেখা যাওয়ার দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি ঘিরে ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ ও শিশু অধিকারকর্মীরা।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শাস্তির নামে শিশুদের ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের সুযোগ নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো।
দেশের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। কওমি মাদরাসার ক্ষেত্রেও শারীরিক নির্যাতন, মানসিক চাপ এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুরা পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকায় অনেক সময় অভিযোগ প্রকাশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী শিশু ভয়, সামাজিক চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ করতে চায় না।
তাদের মতে, কোনো অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা একটি বড় শিক্ষা কাঠামো। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে। অনেক দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের সন্তান এবং এতিম শিশুরাও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
এ কারণে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধরন যাই হোক না কেন, প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তার অধিকার সমান।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা মনে করেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। শিশু মনোবিজ্ঞান, আচরণ ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ইতিবাচক যোগাযোগ বিষয়ে শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
একই সঙ্গে যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের নিয়োগ দেওয়া না হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি বন্ধে আদালতের নির্দেশনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কওমি মাদরাসা সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ইসলামি শিক্ষার মূলনীতিতেও শিশুদের প্রতি ভালোবাসা, সহানুভূতি ও মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে আলেমরা উল্লেখ করেন। শিক্ষার্থীদের শাসনের নামে নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দিয়েছেন অনেক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব।
তাদের মতে, একজন শিক্ষকের দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও আদর্শের মাধ্যমে গড়ে তোলা, ভয় দেখিয়ে নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ও ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বজায় রেখেই শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এজন্য সরকার, শিক্ষা বোর্ড, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
শিশুরা যেন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভয় নয়, বরং নিরাপত্তা ও ভালোবাসার অনুভূতি পায়—এটাই হওয়া উচিত সব শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।
আমার বাঙলা/ রাব্বি