ছবি: এআই।
মতামত

রাষ্ট্রদূত : অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অগ্রসৈনিক

মো. মাহমুদুল হাসান

একটি দেশের দূতাবাস আসলে কী? কেবল জাতীয় পতাকা ওড়ানো একটি ভবন, নাকি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের অগ্রবর্তী ঘাঁটি? প্রশ্নটি এখন আর কূটনৈতিক সৌজন্যের নয়; এটি জাতীয় সক্ষমতার প্রশ্ন। একসময় রাষ্ট্রদূতদের প্রধান কাজ ছিল রাজনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা, সংকট সামাল দেওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয় বার্তা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে সেই ধারণা দ্রুত বদলে গেছে। আজ একটি দেশের প্রকৃত শক্তি অনেক সময় নির্ধারিত হয় তার দূতাবাস কতটি নতুন বাজার খুলতে পারল, কতটি শিল্প বিনিয়োগ টানতে পারল, কতজন দক্ষ কর্মীর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারল কিংবা কতটি প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারল—তার ওপর। একটি সফল বিনিয়োগ চুক্তি বা নতুন রপ্তানি বাজারের দরজা খুলে দেওয়া অনেক সময় শত বক্তৃতা কিংবা অসংখ্য যৌথ বিবৃতির চেয়েও গভীর কূটনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে।

বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো এই সত্য অনেক আগেই বুঝেছে। চীনের রাষ্ট্রদূতেরা শুধু রাজনৈতিক প্রতিনিধি নন; তাঁরা বেইজিংয়ের শিল্পনীতি, উৎপাদনশীলতা ও বাজার সম্প্রসারণের সক্রিয় দূত। জাপানের কূটনৈতিক মিশন দীর্ঘদিন ধরে শিল্প সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং অবকাঠামো বিনিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিদেশি মিশনও কোরীয় শিল্প, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থকে এক সুতোয় বেঁধেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতেও বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল ও কৌশলগত বিনিয়োগ এখন পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় উপাদান। আজকের ভূরাজনীতিতে অর্থনীতি আর কূটনীতি আলাদা নদী নয়; তারা একই মোহনায় গিয়ে মিশেছে।

বাংলাদেশের সামনে বাস্তবতাও বদলাচ্ছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্প, সবুজ জ্বালানি এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে ঘিরে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এই সময়ে আমাদের দূতাবাসগুলো যদি শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগ রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আমরা সুযোগের একটি বড় অংশ হারাব। প্রতিটি দূতাবাসের উচিত নিজ নিজ দেশে কোন শিল্প বাংলাদেশে আসতে পারে, কোন প্রযুক্তি যৌথভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব, কোথায় নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি হচ্ছে এবং কোথায় দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে—এসব নিয়ে নিয়মিত অর্থনৈতিক অনুসন্ধান চালানো। রাষ্ট্রদূতের টেবিলে রাজনৈতিক প্রতিবেদন যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে বিনিয়োগ সম্ভাবনার মানচিত্র, বাজার বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের রূপরেখাও।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তৈরি পোশাক, ওষুধ, চামড়া, জাহাজ নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পে সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে বিশ্ববাজারে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ আগের বছরের তুলনায় কমেছে। এমন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বিনিয়োগ নিজে থেকে কোনো দেশে আসে না; তাকে বিশ্বাস, নীতি এবং সক্রিয় রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে আকৃষ্ট করতে হয়। ঠিক এখানেই দূতাবাসগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তারা যদি সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী, শিল্পগোষ্ঠী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও উদ্ভাবনী কোম্পানির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ গড়ে তোলে, তবে অর্থনৈতিক কূটনীতি কাগজের শব্দ হয়ে থাকবে না; তা বাস্তব কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে রূপ নেবে।

আরেকটি জায়গা আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। দক্ষ জনশক্তির বাজার। বিশ্বের বহু উন্নত দেশে জনসংখ্যার বার্ধক্য দ্রুত বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ ও পরিচর্যা খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদাও বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভাষা প্রশিক্ষণের সঙ্গে দূতাবাসগুলোর শ্রমবাজার বিশ্লেষণকে যুক্ত করতে পারে, তবে বৈধ কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত খুলতে পারে। এতে রেমিট্যান্স বাড়বে, আবার দেশের মানবসম্পদও আরও দক্ষ হয়ে উঠবে।

আমাদের কূটনৈতিক মূল্যায়নের মানদণ্ডও নতুন করে ভাবতে হবে। কেবল কতটি বৈঠক হলো কিংবা কতটি আনুষ্ঠানিক সফর সম্পন্ন হলো, তা দিয়ে একজন রাষ্ট্রদূতের সাফল্য মাপা যথেষ্ট নয়। বরং দেখতে হবে, তাঁর দায়িত্বকালে কতটি নতুন রপ্তানি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, কতটি শিল্প বিনিয়োগ এসেছে, কতটি গবেষণা সহযোগিতা হয়েছে এবং কতজন দক্ষ কর্মীর জন্য বৈধ কর্মসংস্থানের পথ খুলেছে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে কূটনীতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সময় এখনই। কারণ পতাকা বহন করা সম্মানের; কিন্তু সেই পতাকার জন্য নতুন বাজার, নতুন প্রযুক্তি, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন ভবিষ্যৎ অর্জন করাই একজন আধুনিক রাষ্ট্রদূতের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

ভূরাজনৈতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন কৌশল বিশ্লেষক

আমার বাঙলা/ জামান

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

জরুরি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে জাতীয় ক্রাইসিস রেসপন্স সিস্টেম গঠনের দাবি

মানসিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় জরুরি সেবা নিশ্চিত এবং একটি কার্যকর জাতীয় মান...

মায়ের শেষকৃত্যে অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তি পেলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস

চট্টগ্রামে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া মা সন্ধ্যা রাণী ধরের শেষকৃত্যানু...

উন্নয়নের সুফল পৌঁছাচ্ছে প্রান্তিকে, ভূমিকা রাখছেন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মুসা

তিস্তা নদীবেষ্টিত রংপুর বিভাগের দুর্গম ও বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষে...

চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব

চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে এবং...

এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে আজ ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ

গ্রুপ পর্বের হিসাব-নিকাশ এক নিমিষেই পাল্টে গেছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এক হারে। দ...

গালাগালি সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে 

‘গালাগালি সংস্কৃতি’র বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছ...

জাতীয় সংসদে ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ পাস

জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)...

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক পদ থেকে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচ...

জাপানের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বাংলাদেশের মেয়েদের স্বপ্নভঙ্গ

ধারেভারে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ নারী হকি দলের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে শক্তিশ...

প্রফেসর ইউনূসকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ হাইকোর্টের

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধী...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা