দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারের পাঁচ দফা কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, সাইসমিক জরিপ পরিচালনা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করা, প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ও বিডিং এবং এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করা এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে তিনি জানান, ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচির আওতায় ইতোমধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে ১৪০ এমএমসিএফডি গ্যাস যুক্ত হয়েছে। চলমান আরও সাতটি কূপের কাজ শেষ হলে অতিরিক্ত ৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। অবশিষ্ট কূপগুলো পর্যায়ক্রমে খননের জন্য প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে।
গ্যাসের নতুন উৎস অনুসন্ধানে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সাইসমিক সার্ভে এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করতে দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
পিএসসি ও বিডিং
প্রধানমন্ত্রী জানান, অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর বিড রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে। অন্যদিকে অনশোর মডেল পিএসসি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অফশোর ও অনশোর এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন মজুত পাওয়া গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
বাড়ছে এলএনজি অবকাঠামো
এলএনজি অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই টার্মিনাল থেকে রিগ্যাসিফাইড এলএনজি সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে।
এর ফলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এলএনজি আমদানি আরও ৬০০ এমএমসিএফডি বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা কিংবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে জরুরি ভিত্তিতে আরও এক বা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব
সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।
তিনি জানান, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের প্রয়োজনীয় পণ্য—যেমন সোলার প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির ওপর নির্দিষ্ট শর্তে বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ও কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে যারা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তাদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কিনবে। ফলে উৎপাদন খরচের তুলনায় ভালো মুনাফার সুযোগ তৈরি হবে এবং এই সুবিধা পরবর্তী তিন বছর কার্যকর থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছাদে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপনে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির জন্য গাইডলাইনও প্রস্তুত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের সব জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রুফটপ সোলার সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সোলারের পাশাপাশি পানি, বায়ু ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ১০ বছরের পরিকল্পনা
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে আগামী ১০ বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিকল্পনাটির কিছু বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, খুব শিগগিরই জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী সংসদে ও দেশের মানুষের সামনে আগামী ১০ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কীভাবে সাজানো হবে, সে পরিকল্পনা তুলে ধরবেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়া হবে।
ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন প্রসঙ্গে
ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহার মুন্নীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় কয়লা ব্যবহারের বিষয়টি সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, ফুলবাড়ীর কয়লা বিশ্বের উন্নতমানের কয়লাগুলোর একটি। এটি উত্তোলন করা গেলে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
তবে কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের স্বার্থ ও পরিবেশের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। বসতবাড়ি ও কৃষিজমি থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে কীভাবে পুনর্বাসন করা যায় এবং তাদের আয়-রোজগারের বিকল্প ব্যবস্থা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখিত আটটি প্রশ্নের মধ্যে চারটির উত্তর দেন তিনি। পাশাপাশি ছয়টি সম্পূরক প্রশ্নেরও জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।
আমার বাঙলা/ রাব্বি