জাতীয়

আগাম জামিনে ৩ মাসের অপেক্ষা, তাৎক্ষণিক সুরক্ষা কোথায়?

খোন্দকার নিয়াজ ইকবাল

গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় থাকা কোনো ব্যক্তি যাতে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি বা অযৌক্তিক আটক থেকে সাময়িক আইনি সুরক্ষা পান, সেই উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রয়েছে আগাম জামিন (Anticipatory Bail)-এর বিধান। ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারার অধীনে উচ্চ আদালত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই সুরক্ষা প্রদান করতে পারেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ আদালতে আগাম জামিনের আবেদন নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইনজীবী ও বিচারসংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে হাইকোর্টের মাত্র দুই থেকে তিনটি ফৌজদারি মোশন বেঞ্চে আগাম জামিনের আবেদন শুনানি হচ্ছে। ফলে একটি আবেদন শুনানির তালিকায় আসতেই অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যাচ্ছে। এতে যে আইনি প্রতিকার মূলত জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য চালু হয়েছিল, সেটিই কার্যকারিতা হারানোর আশঙ্কায় পড়েছে।

তাৎক্ষণিক সুরক্ষা না মিললে উদ্দেশ্যই ব্যর্থ

আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, আগাম জামিনের মূল দর্শনই হলো দ্রুত বিচারিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে এই ব্যবস্থার বাস্তব উপযোগিতা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। তাদের মতে, সীমিত সংখ্যক বেঞ্চে শুনানির কারণে হাজারো আবেদন জমে থাকছে এবং বিচারপ্রার্থীরা প্রয়োজনের সময় আইনি সহায়তা পাচ্ছেন না।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের অভিমত, হাইকোর্টের সব ফৌজদারি মোশন বেঞ্চে আগাম জামিনের আবেদন গ্রহণ ও শুনানির সুযোগ চালু করা হলে এই সংকট অনেকটাই কমতে পারে।


সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, আগাম জামিনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাৎক্ষণিক আইনি সুরক্ষা। অথচ বর্তমানে একটি আবেদন শুনানির জন্যই কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তার মতে, নির্দিষ্ট কয়েকটি বেঞ্চ ছাড়া অধিকাংশ বেঞ্চ আগাম জামিনের আবেদন শুনতে আগ্রহী নয়। ফলে বিচারপ্রার্থীরা প্রয়োজনের সময় আদালতের সুরক্ষা পাচ্ছেন না। তিনি প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্ট বারের সংশ্লিষ্টদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, আদালত সাধারণত চার, ছয় কিংবা আট সপ্তাহের জন্য আগাম জামিন দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেই সীমিত সময়ের সুরক্ষাও যদি সময়মতো না পাওয়া যায়, তাহলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

কোন পরিস্থিতিতে নেওয়া হয় আগাম জামিন?

আইন অনুযায়ী সাধারণত কয়েকটি পরিস্থিতিতে একজন ব্যক্তি আগাম জামিনের আবেদন করেন—

রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা থেকে মিথ্যা মামলার আশঙ্কা থাকলে।
সামাজিক বা পেশাগত সম্মান ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে মামলা করা হতে পারে— এমন আশঙ্কা দেখা দিলে।
যথাযথ তদন্ত ছাড়াই গ্রেপ্তার বা হয়রানির সম্ভাবনা থাকলে।
জমিজমা, ব্যবসা বা পারিবারিক বিরোধের জেরে ফৌজদারি মামলায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে।

আগাম জামিন স্থায়ী নয়

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, আগাম জামিন কোনো স্থায়ী মুক্তি নয়। আদালত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এই সুবিধা দিয়ে থাকেন। এরপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অবশ্যই নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করে নিয়মিত জামিনের আবেদন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা না করলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা আরও বেড়ে যেতে পারে।


সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, আগাম জামিনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো একজন ব্যক্তিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসা। আদালত সাময়িক সুরক্ষা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতেই হয়।

তার মতে, অতীতে আগাম জামিনের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে বর্তমান সময়ে নাগরিক অধিকার আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘসূত্রিতা সেই প্রত্যাশাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

তিনি আরও মত দেন, হাইকোর্টের প্রতিটি ফৌজদারি বেঞ্চে সপ্তাহে অন্তত একদিন আগাম জামিনের আবেদন শুনানির ব্যবস্থা করা উচিত।


সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান খান আগাম জামিনকে একটি ব্যতিক্রমধর্মী আইনি প্রতিকার হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষ্য, যখন আশঙ্কা থাকে যে কোনো ব্যক্তি অযথা হয়রানির শিকার হতে পারেন এবং তিনি বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবেন না, তখনই আদালত এই বিশেষ সুরক্ষা দিয়ে থাকেন।

তিনি বলেন, অতীতে মামলা হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই আগাম জামিনের আবেদন শুনানি হতো। কিন্তু বর্তমানে তিন থেকে চার মাস পার হলেও অনেক আবেদন শুনানির সুযোগ পাচ্ছে না। এতে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে এবং বিচারব্যবস্থায় এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

তার মতে, এই পরিস্থিতি কার্যত "বিচার বিলম্বিত হওয়া মানেই বিচার না পাওয়া"—এই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।


আইনজীবীদের অভিমত, আগাম জামিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রতিকার যদি সময়মতো কার্যকর না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা দুর্বল হতে পারে।

তাদের দাবি, হাইকোর্টের আরও বেশি সংখ্যক বেঞ্চে আগাম জামিনের শুনানি চালু করা, আবেদন নিষ্পত্তির সময় কমানো এবং জরুরি মামলাগুলো দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। এতে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাও আরও শক্তিশালী হবে।

আমার বাঙলা/ জামান

Copyright © Amarbangla
সবচেয়ে
পঠিত
সাম্প্রতিক

ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ২০

ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২০ জনে...

মাছ-মাংস-ডিমের দামে চাপ

রাজধানীর খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামে স্বস্তি ফিরছে না। ডিম,...

ভুলে যাওয়ার অভ্যাস কখন চিন্তার?

কথা বলতে বলতে হঠাৎ খুব পরিচিত কোনো শব্দ বা নাম মনে করতে পারছেন না—এমন অ...

গার্লফ্রেন্ডকে মেসেজ, জরিমানা ভারতীয় ক্রিকেটারকে

কয়েক দিন আগে আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালসের কোচিং স্টাফের এক সদস্য ম্যাচ চলাকালে...

গ্যাস সংকটে স্বস্তির খবর

টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাসসংকটের পর দেশে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে। এলএন...

দুই ছেলের মৃত্যুতে দিশেহারা সেকান্দর

দুই ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সীতাকুন্ডের উপজেলার ভাটিয়ারী ই...

সামিট-এক্সিলারেটের এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক, জাতীয় গ্রিডে বাড়ল গ্যাস

দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটের মধ্যে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। মহেশখা...

মেসিকে সান্ত্বনা দিয়ে রোনালদোর নতুন রেকর্ড

বাবার স্মৃতিতে মেসি একটি আবেগঘন বার্তা প্রকাশের পর তার পোস্টের নিচে মন্তব্য ক...

বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে নতুন দায়িত্বে ৪ নেতা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন করে চার নেতাকে সদস্...

মন খারাপ হলে চোখ কাঁদে কেন?

কখনো কি এমন হয়েছে, সামান্য কোনো ঘটনায় হঠাৎ চোখে পানি চলে এসেছে? পরে হয়তো বুঝে...

লাইফস্টাইল
বিনোদন
খেলা